সূরা: ২. আল-বাকারা (اَلْبَقَرَةِ)
৫৮ নং আয়াতের তাফসীর

٥٨ - وَ اِذۡ قُلۡنَا ادۡخُلُوۡا هٰذِهِ الۡقَرۡیَۃَ فَکُلُوۡا مِنۡهَا حَیۡثُ شِئۡتُمۡ رَغَدًا وَّ ادۡخُلُوا الۡبَابَ سُجَّدًا وَّ قُوۡلُوۡا حِطَّۃٌ نَّغۡفِرۡ لَکُمۡ خَطٰیٰکُمۡ ؕ وَ سَنَزِیۡدُ الۡمُحۡسِنِیۡنَ
উচ্চারণ: ওয়া ইয কুলনাদখুলূ হাযিহিল ক্বারইয়াতা ফাকুলূ মিনহা হাইসু শি’তুম রাগাদাঁ, ওয়াদখুলুল বাবা সুজ্জাদাঁ, ওয়াকুলূ হিত্তাহ, নাঘফির লাকুম খাতোয়্যাকুম। ওয়া সানাজীদুল মুহসিনীন।
অনুবাদ: আর স্মরণ কর, যখন আমি বললাম, ‘তোমরা প্রবেশ কর এই জনপদে। আর তা থেকে আহার কর তোমাদের ইচ্ছানুযায়ী, স্বাচ্ছন্দ্যে এবং দরজায় প্রবেশ কর মাথা নীচু করে। আর বল ‘ক্ষমা’। তাহলে আমি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেব এবং নিশ্চয় আমি সৎকর্মশীলদেরকে বাড়িয়ে দেব’।

তাফসীর

আয়াতের প্রতিটি অংশের তাফসীর

وَ اِذۡ قُلۡنَا ادۡخُلُوۡا هٰذِهِ الۡقَرۡیَۃَ

“যখন আমি বলেছিলাম, ‘তোমরা এই নগরীতে প্রবেশ করো’” — এখানে ইসরাইলি জাতিকে কোনো নির্দিষ্ট নগরীতে প্রবেশের আদেশ দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ মুফাসসিরগণ বলেন, এটি বাইতুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম) ছিল।

فَکُلُوۡا مِنۡهَا حَیۡثُ شِئۡتُمۡ رَغَدًا

“এবং সেখানে যেখান থেকে ইচ্ছা প্রচুর পরিমাণে আহার করো” — আল্লাহ্ তাদের জানিয়ে দিচ্ছেন, এই শহরে তারা স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করতে পারবে এবং প্রয়োজনীয় রিযিকের অভাব হবে না।

وَّ ادۡخُلُوا الۡبَابَ سُجَّدًا

“আর দরজায় সেজদাবনত হয়ে প্রবেশ করো” — আল্লাহ্ আদেশ করেন, তারা যেন বিনয় ও নম্রতার সাথে শহরে প্রবেশ করে। এটি কৃতজ্ঞতা ও বিনয় প্রদর্শনের নিদর্শন।

وَّ قُوۡلُوۡا حِطَّۃٌ

“এবং বলো: হিত্তাহ (ক্ষমা)” — হিত্তাহ অর্থ: হে আল্লাহ্, আমাদের পাপ ক্ষমা করে দিন। এটি ছিল তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশনা।

نَّغۡفِرۡ لَکُمۡ خَطٰیٰکُمۡ

“তাহলে আমি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেব” — আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি দেন, যদি তারা বিনয় সহকারে প্রবেশ করে এবং ক্ষমা চায়, তবে তাদের পূর্ববর্তী পাপসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে।

وَ سَنَزِیۡدُ الۡمُحۡسِنِیۡنَ

“আর আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কার আরও বাড়িয়ে দেব” — যারা কেবল আদেশ মানেই না, বরং উত্তমরূপে পালন করে, তাদের জন্য অতিরিক্ত পুরস্কার দেওয়া হবে।


আয়াতের ব্যাখ্যা

এই আয়াতে আল্লাহ্ বনী ইসরাইলকে তাঁর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। তাদের বলা হয় শহরে প্রবেশ করতে, যেখানে তাদের খাদ্য ও নিরাপত্তা থাকবে। কিন্তু এটি বিনয় ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের সঙ্গে করতে বলা হয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমার দরজা খোলা থাকে, যদি তারা আন্তরিকভাবে ক্ষমা চায়। কিন্তু ইতিহাসে দেখা যায়, তারা এই নির্দেশ অমান্য করে ব্যঙ্গ করে, ফলে আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে।


আয়াতের শিক্ষা

  • আল্লাহ্ আমাদের জীবনের জন্য পথনির্দেশনা ও সুবিধা দিয়ে থাকেন, কিন্তু তাতে আনুগত্য আবশ্যক।

  • বিনয় ও কৃতজ্ঞতাসহকারে আল্লাহর নিয়ামত গ্রহণ করা উচিত।

  • তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা আল্লাহর পক্ষ থেকে পাপ মোচনের বড় মাধ্যম।

  • সৎকর্মশীলদের জন্য আল্লাহর রহমত ও পুরস্কার সবসময়ই বাড়তি থাকে।


নাযিলের প্রেক্ষাপট (সাবাবুন নুজুল)

এই আয়াতটি বনী ইসরাইলের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তারা যখন মিসর থেকে মুক্তি পেয়ে প্রতিশ্রুত ভূমির (বাইতুল মুকাদ্দাস) দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন আল্লাহ্ তাদের এই শহরে প্রবেশের নির্দেশ দেন। এটি ছিল একটি পরীক্ষাও— তারা কতটা আনুগত্য দেখায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, তারা এই আদেশে অবহেলা ও ব্যঙ্গ করে, ফলে পরে তাদের উপর শাস্তি নেমে আসে।


তাফসীরে:

পূর্বের আয়াত পরবর্তী আয়াত