সূরা: ২. আল-বাকারা (اَلْبَقَرَةِ)
৩০ নং আয়াতের তাফসীর

٣٠ - وَ اِذۡ قَالَ رَبُّکَ لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اِنِّیۡ جَاعِلٌ فِی الۡاَرۡضِ خَلِیۡفَۃً ؕ قَالُوۡۤا اَتَجۡعَلُ فِیۡهَا مَنۡ یُّفۡسِدُ فِیۡهَا وَ یَسۡفِکُ الدِّمَآءَ ۚ وَ نَحۡنُ نُسَبِّحُ بِحَمۡدِکَ وَ نُقَدِّسُ لَکَ ؕ قَالَ اِنِّیۡۤ اَعۡلَمُ مَا لَا تَعۡلَمُ
উচ্চারণ: ওয়া ইয ক্বা-লা রাব্বুকা লিল মালা-ইকাতি ইন্নী জা-ইলুন ফিল আরদি খলীফাহ, ক্বা-লু আতাজ‘আলু ফীহা মান ইউফসিদু ফীহা ওয়া ইয়াসফিকুদ্ দিমা-আ; ওয়া নাহনু নুসাব্বিহু বিহামদিকা ওয়া নুক্বাদ্দিসু লাকা, ক্বা-লা ইন্নী আ‘লামু মা-লা তা‘লামুন।
অনুবাদ: আর স্মরণ কর, যখন তোমার রব ফেরেশতাদেরকে বললেন, ‘নিশ্চয় আমি যমীনে একজন খলীফা সৃষ্টি করছি’, তারা বলল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে তাতে ফাসাদ করবে এবং রক্ত প্রবাহিত করবে? আর আমরা তো আপনার প্রশংসায় তাসবীহ পাঠ করছি এবং আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। তিনি বললেন, নিশ্চয় আমি জানি যা তোমরা জান না।

তাফসীর

আয়াতের প্রতিটি অংশের তাফসীর

وَ اِذۡ قَالَ رَبُّکَ لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ

"আর স্মরণ করো, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদেরকে বললেন" — এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, যখন আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে জানান যে তিনি নতুন এক সৃষ্টি পৃথিবীতে স্থাপন করতে যাচ্ছেন। এখানে "রব্বুকা" শব্দটি দ্বারা আল্লাহ ও নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বোঝানো হয়েছে।

اِنِّیۡ جَاعِلٌ فِی الۡاَرۡضِ خَلِیۡفَۃً

"আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি (খলীফা) সৃষ্টি করতে যাচ্ছি" — "খলীফা" শব্দটি দ্বারা এমন একজনকে বোঝানো হয়েছে, যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে শাসন ও দায়িত্ব পালন করবেন। এটি মানবজাতির মর্যাদা ও উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে — তারা শুধু জীবিত প্রাণী নয়, বরং দায়িত্বশীল সৃষ্টির প্রতিনিধি।

قَالُوۡۤا اَتَجۡعَلُ فِیۡهَا مَنۡ یُّفۡسِدُ فِیۡهَا وَ یَسۡفِکُ الدِّمَآءَ

"তারা বলল, আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে সেখানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে ও রক্তপাত করবে?" — ফেরেশতারা মানবজাতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল না আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা; বরং তারা মানবজাতির সম্ভাব্য দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।

وَ نَحۡنُ نُسَبِّحُ بِحَمۡدِکَ وَ نُقَدِّسُ لَکَ

"আর আমরা তো আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করি" — ফেরেশতারা নিজেদের ইবাদতের কথা উল্লেখ করে বলতে চাইলেন, যে আমরা আপনাকে যথাযথভাবে ইবাদত করছি, তাহলে এমন সৃষ্টি কেন, যারা গুনাহ করবে?

قَالَ اِنِّیۡۤ اَعۡلَمُ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ

"তিনি বললেন, আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না" — আল্লাহর জ্ঞান সর্বব্যাপী ও পরিপূর্ণ। তিনি জানেন যে, যদিও মানুষ দোষ করে, কিন্তু তাদের মধ্যে নবী, রাসূল, শহীদ, সৎকর্মপরায়ণ ও আল্লাহর প্রেমিকগণও থাকবে। এই জবাবটি মানুষের উচ্চ মর্যাদার দিকেও ইঙ্গিত করে।


আয়াতের ব্যাখ্যা

এই আয়াতটি মানব সৃষ্টির সূচনা এবং ফেরেশতাদের সঙ্গে আল্লাহর প্রথম আলোচনার একটি অংশ। এখানে মানবজাতিকে "খলীফা" হিসেবে উল্লেখ করে তাদের উপর দায়িত্ব অর্পণের কথা বলা হয়েছে। ফেরেশতারা আল্লাহর জ্ঞান ও হিকমত মেনে নিয়েছেন, তবে তারা জানতে চেয়েছেন কেন এমন একটি সৃষ্টি আনা হবে যারা ফিতনা ও রক্তপাত করবে। উত্তরে আল্লাহ বলেন, তাঁর জ্ঞান সীমাহীন — মানুষ হয়তো দুর্নীতি করবে, কিন্তু তাদের মধ্য থেকে ঈমানদার, ন্যায্য, দয়ালু ও ইবাদতকারীগণও হবে।


আয়াতের শিক্ষা

মানবজাতির মর্যাদা ও দায়িত্ব — মানুষকে শুধু সৃষ্টি করা হয়নি, বরং তাকে ‘খলীফা’ বা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহর সিদ্ধান্তে হিকমত থাকে — এমন অনেক বিষয় আছে যা আমাদের বোধগম্য না হলেও, আল্লাহর জ্ঞানে তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে।

সৃষ্টি ও প্রশ্ন করার স্বাধীনতা — ফেরেশতারা প্রশ্ন করেছে, কিন্তু সেটা অস্বীকৃতি নয়; বরং তারা জানতে চেয়েছে আল্লাহর হিকমতের ব্যাখ্যা।

দ্বৈত প্রকৃতি ও বিকাশের সম্ভাবনা — মানুষ একদিকে পাপ ও রক্তপাত করতে পারে, আবার অন্যদিকে আত্মোন্নতির মাধ্যমে নবী, ওলী, শহীদ বা আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারে।


নাযিলের প্রেক্ষাপট (সাবাবুন নুজুল)

এই আয়াতটি এমন এক সময়ে নাজিল হয় যখন মক্কার কাফেররা নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর খিলাফত ও নেতৃত্বকে অস্বীকার করছিল। আল্লাহ এই আয়াতের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চাইলেন, খলীফা বানানোর সিদ্ধান্ত তাঁর — মানুষ পাপ করে বলেই তাদের সৃষ্টি বন্ধ হয়নি; বরং তাদের জন্যই হেদায়াত ও নবী পাঠানো হয়েছে। এটি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর রিসালাত ও মানবজাতির সম্মান পুনরায় স্থাপন করে।


তাফসীরে:

পূর্বের আয়াত পরবর্তী আয়াত