সূরা: ২. আল-বাকারা (اَلْبَقَرَةِ)
২৮ নং আয়াতের তাফসীর

٢٨ - کَیۡفَ تَکۡفُرُوۡنَ بِاللّٰهِ وَ کُنۡتُمۡ اَمۡوَاتًا فَاَحۡیَاکُمۡ ۚ ثُمَّ یُمِیۡتُکُمۡ ثُمَّ یُحۡیِیۡکُمۡ ثُمَّ اِلَیۡهِ تُرۡجَعُوۡنَ
উচ্চারণ: কাইফা তাকফুরূনা বিল্লাহি ওয়া কুনতুম্ আমওয়াতান্ ফা আহইয়াকুম্, সুম্মা ইউমীতুকুম্, সুম্মা ইউহইয়ীকুম্, সুম্মা ইলাইহি তুরজাউন।
অনুবাদ: কীভাবে তোমরা আল্লাহর সাথে কুফরী করছ অথচ তোমরা ছিলে মৃত? অতঃপর তিনি তোমাদেরকে জীবিত করেছেন। এরপর তিনি তোমাদেরকে মৃত্যু দেবেন অতঃপর জীবিত করবেন। এরপর তাঁরই নিকট তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে।

তাফসীর

আয়াতের প্রতিটি অংশের তাফসীর

کَیۡفَ تَکۡفُرُوۡنَ بِاللّٰهِ
"তোমরা কীভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করো?" — এখানে বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে। আল্লাহর অস্তিত্ব ও কর্তৃত্ব এত সুস্পষ্ট, এত স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ রয়েছে, অথচ মানুষ কিভাবে তাঁকে অস্বীকার করে — এটাই বিস্ময়ের বিষয়। এটা অবিশ্বাসীদের যুক্তিহীনতা ও অকৃতজ্ঞতার প্রতি একটি কঠিন প্রশ্ন।

وَ کُنۡتُمۡ اَمۡوَاتًا
"আর তোমরা মৃত ছিলে" — এখানে "মৃত" বলতে জীবনের পূর্ব অবস্থা বোঝানো হয়েছে, যখন মানুষ অস্তিত্বহীন ছিল, জীবনের কোনো চিহ্ন ছিল না। এটি মানুষের সৃষ্টি-পূর্ব অবস্থা নির্দেশ করে, যখন সে ছিল ধূলিকণা বা মৃতদেহরূপে।

فَاَحۡیَاکُمۡ
"তখন তিনি তোমাদের জীবিত করলেন" — আল্লাহ মানুষকে নিঃসৃত জীবনের সাথে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে দেহ, আত্মা এবং চেতনা দান করে তাকে জীবিত করেছেন এবং সচল করে দিয়েছেন।

ثُمَّ یُمِیۡتُکُمۡ
"এরপর তিনি তোমাদের মৃত্যু দেবেন" — প্রতিটি জীবকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এটি আল্লাহর নির্ধারিত নিয়ম। জীবনের পর মানুষ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।

ثُمَّ یُحۡیِیۡکُمۡ
"এরপর তিনি আবার তোমাদের জীবিত করবেন" — মৃত্যু পরবর্তী পুনরুত্থান বোঝানো হয়েছে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ সমস্ত মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন, যাতে তারা নিজেদের কর্মফল লাভ করে।

ثُمَّ اِلَیۡهِ تُرۡجَعُوۡنَ
"তারপর তোমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করবে" — সবকিছুর শেষ পরিণতি আল্লাহর কাছেই। বিচার দিবসে সবাই আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে এবং তাঁর বিচার অনুযায়ী ফল পাবে।


আয়াতের ব্যাখ্যা


এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বিস্ময় প্রকাশ করে জিজ্ঞাসা করছেন, মানুষ কীভাবে এমন সত্তাকে অস্বীকার করতে পারে, যিনি তাকে কিছুই থেকে সৃষ্টি করেছেন? মানুষ সৃষ্টি-পূর্বে ছিল অজ্ঞান, অচেতন এবং মৃত। আল্লাহ তাকে জীবন দান করেন, অতঃপর মৃত্যুর স্বাদ দেন, তারপর পুনরায় জীবিত করে তাঁর কাছেই ফেরত নেন। এটি একটি স্পষ্ট যুক্তি, যে মানবজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ইচ্ছা ও নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হয়। কাজেই তাঁকে অস্বীকার করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।


আয়াতের শিক্ষা

আল্লাহর অস্তিত্ব ও কুদরত প্রমাণিত — এই আয়াত মানুষের সৃষ্টি, জীবন ও মৃত্যুর মাধ্যমে আল্লাহর কুদরত ও কর্তৃত্ব তুলে ধরে।

আখিরাতের প্রতি ঈমান — আয়াতটি আমাদের শেখায় যে মৃত্যুর পর আবার জীবন রয়েছে, এবং আমাদের আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে।

আল্লাহর অস্বীকৃতি যুক্তিহীন — মানুষের অস্তিত্বই আল্লাহর অস্তিত্ব ও নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ, তাই তাঁকে অস্বীকার করা যুক্তিহীন ও অকৃতজ্ঞতা।

জীবনের উদ্দেশ্য — মানুষের জীবন এক নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সৃষ্টি হয়েছে, এবং সেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তাকে আল্লাহর নিকট ফিরে গিয়ে জবাবদিহি করতে হবে।


নাযিলের প্রেক্ষাপট (সাবাবুন নুজুল)

এই আয়াতটি মদিনায় অবতীর্ণ সূরা আল-বাকারা’র অংশ। এটি বিশেষভাবে অমুসলিম ও মুনাফিকদের জন্য একটি যুক্তিনির্ভর চ্যালেঞ্জ ছিল। তারা আল্লাহর অস্তিত্ব ও পুনরুত্থানে সন্দেহ করত। এ আয়াত তাদের সামনে জীবন-মৃত্যু-পুনর্জন্মের স্পষ্ট চক্র তুলে ধরে প্রমাণ করে যে, আল্লাহই একমাত্র স্রষ্টা ও পুনর্জীবনের কর্তা। এটি মুসলমানদের জন্যও ঈমান দৃঢ় করার একটি মাধ্যম হিসেবে নাজিল হয়েছিল।


তাফসীরে:

পূর্বের আয়াত পরবর্তী আয়াত